কালো বোতলের জল : অমৃতা ভট্টাচার্য

Bengali Short Story: শরীরের সব শক্তি দিয়ে পারমিতার হাত থেকে বোতলটা নিয়ে সামনে ছুঁড়ে দেয় শীর্ষ। মেঝে পেরিয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে বোতলটা বারান্দায় গিয়ে পড়ে।

-“আরে ওখানে কী? এদিকে আসুন।“ মুখ থেকে ঠস করে তুলিটা পড়ে গেল মেঝেতে। ধৃতিমান সুন্দর হাঁ হাঁ করে ছুটে এলেন।

-"না, এই এত বড় বোতল… এতে কি জল থাকে?” – চমকে উঠে দু'পা পিছিয়ে ভ্যাবলার মতো মুখ করে বলে উঠল শীর্ষ।

-“বোতল না… কালো বোতল বলুন…” ঠোঁটে একটা চাপা হাসি এনে চশমার ওপর দিয়ে ধৃতিমান শীর্ষর চোখের দিকে তাকাল।

-"হ্যাঁ, কালো বোতল –” বোতলটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল শীর্ষ। তারপর ধৃতিমানের দিকে তাকিয়ে ফস করে বলে ফেলল, “কিন্তু এত বড়… আগে এরকম দেখিনি তো! এতে জল থাকে?”

-“কী থাকে না সেটাই বলুন!” সামনে ঝুঁকে মেঝের ওপর থেকে তুলিটা তুলে সামনে টুলের ওপর রাখল ধৃতিমান। “আপনি এদিকে সোফায় বসুন। ওই হলুদ পানীয়টি আপনার। ওটা শেষ হলে একটা সবুজ দিতে পারি।“

সোফার উপর অসংখ্য পত্রিকা ছড়ানো। ক্যানভাসের দিকে আবার তাকাল শীর্ষ। পুরোটা কালো রঙে মাখামাখি। বাইরে বৃষ্টির তেজটা বেশ বেড়েছে। সকাল এগারোটায় এরকম আকাশ কালো করা বৃষ্টি আগে কবে দেখেছে মনে পড়ে না শীর্ষর। ধৃতিমান সোফার কোণে একজনের বসার মতো একটা জায়গা পরিষ্কার করে শীর্ষর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হাসল, “একা থাকলে যা হয়, বোঝেনই তো!”

শীর্ষ নিঃশব্দে হেঁটে এসে সোফার কোণে বসল। সোফার সামনে চায়ের টেবিলের উপর কাঁচের গ্লাসে হলুদ রঙের সম্ভবত অরেঞ্জ জুস। আনন্দ সুন্দরের বাড়িতে এর আগেও একবার এসেছে সে। সেবারও খবরের কাগজের হয়ে সাক্ষাৎকার নেবার জন্য। আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার পর সব কাগজই যেমন আনন্দ সুন্দরের মতো বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর সাক্ষাৎকার নিতে আসে! কিন্তু সেবার বসার ঘরে কয়েকটা সাধারণ আলাপ আলোচনার পরই ছেলে ধৃতিমান সুন্দর এসে ওঁর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কথার মাঝখানেই। তুলিতে জাদু ছিল আনন্দ সুন্দরের। রঙের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে এমন অদ্ভুত সব রঙ আনতেন ক্যানভাসে, সারা পৃথিবী মুগ্ধ হয়ে অপেক্ষায় থাকত তাঁর পরের ছবির জন্য। যার অগুনতি ছবি বিদেশে রপ্তানি হয়েছে, দেশের সরকার যার নামে উপকূলবর্তী এক দ্বীপের নাম রেখেছে ‘আনন্দসুন্দর দ্বীপ’– তাঁকে সামনে থেকে দেখে এক উদ্ভ্রান্ত মনোরোগী ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি শীর্ষর। কালো আলখাল্লার উপর বেমানান হাফ হাতা বাউল জ্যাকেট, এলোমেলো রুক্ষ লম্বা চুল, শীর্ণ চেহারা। শুধু কোটরগত দুটো চোখে অদ্ভুত ধূসর রঙ। ধূসর চোখে এমন অপার্থিব আলো আগে কখনও দ্যাখেনি শীর্ষ! সামনে বসে সামান্য কয়েকটা প্রশ্নের দু' এক শব্দে উত্তর দিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করে কত কিছু যেন বলছিলেন আনন্দ সুন্দর। কথা বুঝতে না পারলেও তাঁর বারবার ঝলকে ওঠা উজ্জ্বল চোখদুটো থেকে চোখ সরাতে পারেনি শীর্ষ।

আরও পড়ুন- একটা ফ্লাইওভার ও আলোর গল্প: অমৃতা ভট্টাচার্য

-“না না, আর দরকার নেই। আমাকে অফিসে ফিরতে হবে। আমি শুধু আপনার কয়েকটা বাইট নেব আনন্দ সুন্দর, মানে আপনার বাবার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে – উনি তো ইদানীং বাড়ি থেকে সেরকম বেরোতেন না। তাহলে? এমনকী নিখোঁজের খবরটাও বেশ কয়েকদিন পরে সবাই জানল”, চোখ দুটো তীক্ষ্ণ করে সোফার একদিকটা ধরে শীর্ষ বলে উঠল, “কেন?”

-“ওটা নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। এখনও সন্দেহ করার মতো কিছু পায়নি।“ ভ্রু কুঁচকে ডানদিকে জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে মুখস্থ বলার মতো বলে গেল ধৃতিমান।

-“কিন্তু আনন্দ সুন্দরের নিখোঁজ হওয়াটা – মানে -- বাড়িতে কি কোনও হামলা হয়েছিল? বা, উনি কি কোনও কারণে বাইরে বেরিয়েছিলেন? আপনি তো এখানেই থাকতেন ওঁর সঙ্গে –” শীর্ষ টেবিল থেকে গ্লাসটা তুলে মুখে ঠেকাল।

-“দেখবেন, আপনি কিন্তু হলুদ তরল পান করছেন।“ ধৃতিমান তার রোগা হিলহিলে তর্জনীটা গ্লাসের দিকে বাড়াল। শীর্ষ দেখল, চেহারায় বাবা-ছেলের যথেষ্ট মিল থাকলেও আনন্দ সুন্দরের চোখের ঔজ্জ্বল্য ধৃতিমানের চোখে নেই। ধৃতিমানের চোখ গভীর, কিন্তু ঘোলাটে।

-“মানে?” চুমুক দিতে গিয়েও থমকে গেল শীর্ষ।

-“ওই যে রং… সব আলাদা আলাদা।“ দু'পা ঈষৎ ফাঁক করে ক্যানভাসের সামনে টুলের উপর বসে দু'হাতে টুলের কাঠ ধরে সামনে ঝুঁকলেন ধৃতিমান। “যে রং আপনি ভিতরে নেবেন, সেই রংটুকুই বেঁচে থাকে শুধু” – হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে গেলেন ধৃতিমান। মাথা তুলে শীর্ষর হাতের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে হলুদ রং পান করছেন, আপনার ভিতরে এখন শুধু হলুদ রঙের বেঁচে থাকা। যখন লাল নেবেন, তখন লাল, যখন সবুজ নেবেন, সবুজ, নীল নিলে নীল –” বলতে বলতে ধৃতিমানের চোখদুটো আরও ঘোলাটে হয়ে উঠল।

-“কী বলছেন? হলুদ নিলে হলুদ, লাল নিলে লাল – এসব কী?” শীর্ষ ভ্রু কুঁচকে গ্লাসটা আবার সামনের টেবিলে রাখল। এমনিতে এসব শিল্পীরা পাগলাটে হয়। সকাল সকাল মদ গিলেছে। আঙুলগুলো তো দেখেই বোঝা যায় নিয়মিত গাঁজা পাকানোর দাগ। আবার কিছু মেশালো কিনা কে জানে!

-“তরল আর রঙের সম্পর্ক জানেন না? মিশে যায় তো – তরলের পাশে রঙ থাকলে মিশে যায় – তারপর সেটা বাকি সব কিছু গিলে নেয় – গলার ভিতর দিয়ে ভিতরে ঢোকে, তারপর আপনি হলুদ হবেন… কিম্বা নীল… কিম্বা লাল… তখন আর আপনি মানুষ নন… শুধুই রং… কিম্বা রং-মানুষ! হা হা হা," অট্টহাসি হেসে উঠলেন ধৃতিমান। তারপর থেমে শীর্ষর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “জুসটা খেয়ে নিন রিপোর্টার।”

একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে শীর্ষর। লোকটা সুবিধের মনে হচ্ছে না। হাতে বেশি সময়ও নেই। কিছুটা তথ্য নিয়ে অফিসে ঢুকতে হবে। এদিকে লোকটা ভুল বকে যাচ্ছে তখন থেকে। যা ওয়েদার! অফিস সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ঢুকতে পারলে হয়!

-“না, আমি ভাবছিলাম আপনার সঙ্গে শেষবার আপনার বাবার যখন কথা হয়েছিল... –” শীর্ষ গলা ঝেড়ে শুরু করল আবার।

--“বিশ্বাস হল না তো?” ধৃতিমান ঘাড় কাত করে বলল, “অবশ্য বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নয় – এটা কেউ জানতে পারে, বুঝতে পারে, অনুভব করে – আর কেউ করে না। বাবা পারতেন। তাই তো এরকম –” হঠাৎ ক্যানভাসের পাশে কালো বোতলটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে দেখুন এই বোতলটায়… রংটা তো তরল নয়, ভিতরের জলটা তরল বলে সব কালো হয়ে গেল। কালো রং কেন কালো জানেন তো? সব শুষে নেয় তাই… রং সর্বগ্রাসী, রিপোর্টার সাহেব, সে যেখানেই থাকুক।“ ধৃতিমান আবার তাকালেন শীর্ষর দিকে, “আচ্ছা রিপোর্টার, আপনি তখন ওই বোতলটার দিকে যাচ্ছিলেন কেন?”

-“কালো বোতল ভালো লাগে। এই বোতলটা অদ্ভুত!”

শীর্ষর মনে পড়ল, বাড়িতে পারমিতার সঙ্গে বোতলের রং নিয়ে খুনসুটি। পারমিতার রং নিয়ে খুব বাতিক। জলের বোতলের রং নাকি গোলাপি, সাদা, হাল্কা সবুজ বা হাল্কা নীল না হলে তার জল খেতেই ভালো লাগে না। এদিকে শীর্ষর কালো, ধূসর এসব বোতল দেখলে বেশ আভিজাত্যপূর্ণ মনে হয়। শীর্ষর আনা কালো বোতলটা তো পারমিতা ব্যবহারই করে না বাড়িতে। ওটা পড়েই আছে কোথাও!

-“হ্যাঁ, কালো বোতল তো – অদ্ভুতই!” মুহূর্তের মধ্যে টুল ছেড়ে উঠে এসে শীর্ষর সামনে দাঁড়াল ধৃতিমান। “আপনি খবর চান, না? এটার খবর করুন না… এই যে… এই যে কালো বোতলটা।“

বাইরে ভয়ংকর শব্দে একটা বাজ পড়ল কোথায়! বিদ্যুতের আলো ঝলকে এল ঘরের দেওয়ালে। ধৃতিমান কালো বোতলটার কাছে দাঁড়াল। শীর্ষ আবার দেখল বোতলটাকে। সাধারণ বোতলের মতোই। আকারে বেশ বড়। ক্যানভাসের পাশে আর একটা লম্বা টুলের উপর রাখা আছে। বোতলের মুখে কোনও ছিপি নেই। মুখটাও বেশ বড়। খোলা।

-“সেদিন কিন্তু বাইরেটা বেশ রোদ ঝলমলে ছিল। বাবা এই… এই ক্যানভাসটায় কালো মেঘ… দুর্যোগের আকাশ আঁকতে গেল।“ ক্যানভাসের খুব কাছে সামনে দাঁড়াল ধৃতিমান। “সারা ক্যানভাসে শুধু কালো মেঘ… আর কালো রংটাও সেদিন যেন আরও কালো… বাবা পারতেন নতুন রঙ বানাতে… কত কত রং… আর সেদিন শুধু কালো – কতরকম কালো… কালো রঙের যে এত স্তর, না দেখলে জানতাম না কোনওদিন! ছবিটা প্রায় শেষ জানেন,” ঘাড় ঘুরিয়ে শীর্ষর দিকে তাকালেন ধৃতিমান। “হঠাৎ একটা বড় তুলি নিয়ে ছবিটার উপর থেকে নীচে কালো রঙ দিয়ে ঢেকে দিলেন বাবা। তারপর পাগলের মতো সেই তুলিটা নিয়ে বারবার বারবার কালো রঙ দিয়ে… পুরো ক্যানভাসটা তখন শুধু কালো… শূন্য ক্যানভাস একটা। আমি ঘরেই ছিলাম। কালো তুলিটা হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সব আকাশ, সব রং কালোর মধ্যে গেল… আর কোনও ছবি নেই, আর কোনও রং নেই।“

-“তারপর?” শীর্ষর মনে হলো, এখন যদি মাতাল গাঁজাখোরটার পেটের ভিতর থেকে কোন খবর বেরোয়। উফফ! একটা ক্লু পেলে ও দেখিয়ে দেবে বসকে। সামনেই প্রোমোশনের সময়।

-“হাতের তুলিটা নিয়ে এই কালো বোতলটায় ডুবিয়ে দিলেন বাবা।“ ধৃতিমান আবার গিয়ে দাঁড়ালেন কালো বোতলটার সামনে।

-“তারপর?” শীর্ষর এবার ধৈর্যহানি হচ্ছে মনে হলো।

-”এই ঘর থেকে বেরিয়ে বাবা শোবার ঘরে গেলেন।“ আবার থেমে গেল ধৃতিমান।

-“তাতে কী হলো?”

-“পরের দিন আঁকার ঘরে এসে বোতলের মধ্যে তুলিটা আর খুঁজে পাননি বাবা।“

-“মানে?”

-“তুলিটা আর ছিল না ওখানে।“ ধৃতিমানের ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি শূন্য।

-“কেউ তুলে নিয়েছিল হয়তো! তাতে কী হলো?”

-“তারপর অনেকগুলো তুলি, ঘড়ি, পেন্সিল সব ফেলেছিলেন বাবা। কিছুই আর পাওয়া যায়নি – ওই ক্যানভাসের ওই কালো আকাশটা তুলির সঙ্গে ওই বোতলে ঢুকে গেল… বাবা ঝুঁকে… অনেকটা ঝুঁকে বোতলের মধ্যে সব খুঁজতে গিয়ে… বাবা বলতেন, মহাকাশে কালো গর্ভে যা যায় তা আর ফেরে না,” বলতে বলতে বিড়বিড় করে আবার টুলের উপর বসে দুলতে লাগলেন ধৃতিমান।

-“বলছি বাবার সঙ্গে আপনার শেষ দেখা কবে হয়েছিল? আপনি এ ব্যাপারে তো কিছু বলছেন না – ধৃতিমানবাবু… শুনছেন? উফফ!” সোফা থেকে উঠে ধৃতিমানকে ধরে প্রায় নাড়াতে লাগল শীর্ষ। আর একটু হলেই টলে পড়তেন ধৃতিমান। কোনওরকমে তাকে ধরে সোফায় বসিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রাইভারকে ফোন করতে করতে গেট দিয়ে বেরিয়ে এল শীর্ষ। বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশটা থমথমে এখনও।

 

আরও পড়ুন- আয়না ভবন : সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায়

 

ঘরে ঢুকে মেজাজটা চড়ে গেল শীর্ষর। একে অফিসের কাজের বারোটা বেজেছে সকালে মাতালের পাল্লায় পড়ে, ওইসব গাঁজাখুরি গল্প তো আর বসকে শোনানো যায় না। তার উপর অফিসের গাড়ির সমস্যার জন্য আজ তাকে বাসে ঝোলাঝুলি করে ফিরতে হয়েছে। বৃষ্টি হলে একটু রাত বাড়লেই তো ট্যাক্সির বিচ্ছিরি রকমের বেশি ভাড়া। এখন ঘরে ঢুকে এই প্যানপেনে বাংলা সিরিয়ালে মুখ গুঁজে বসে আছে পারমিতা।

-“খিদে পেয়েছে। আজ তাড়াতাড়ি ঘুমবো। সারাদিন যা গেল! আর ভালো লাগছেনা।“ শীর্ষ খাবার টেবিলের সামনে বসে পড়ে।

-“কিছু সমস্যা হয়েছে? দাঁড়াও- “ রুটির প্লেট দুটো টেবিলে রাখল পারমিতা। “শরীর ঠিক আছে তো? আজ জল ভরতে গিয়ে আমার বোতলটা হাত থেকে পড়ে ফেটে গেছে। তোমার ওই বাজে কালো বোতলটায় আজ জল ভরতে হবে। কাল সকালে বাজারে যাব। একেবারে পিঙ্ক সেট পাঁচটা কিনে নেব।“ চিকেনের বাটিটা শীর্ষর দিকে এগিয়ে দেয় পারমিতা।

-“আবার বোতল? উফফ!” রুটির টুকরোটা ছিঁড়তে গিয়েও থেমে যায় শীর্ষ।

-“আবার বোতল কী? এই দ্যাখো না, লেবুর টুকরো ভরে রেখেছি জল দিয়ে। পরিষ্কার করে জলটা ভরে নিই। তুমি খেয়ে নাও।“ নিজের খাবারের প্লেটটা ঢাকা দিয়ে খাবার টেবিলের একদিকে রাখা কালো বোতলটা হাতে তুলে নিয়ে ঝাঁকাতে শুরু করে পারমিতা।

খাবার চিবোতে চিবোতে পারমিতার হাতে ধরা কালো বোতলটার দিকে তাকায় শীর্ষ। একটা অচেনা অস্বস্তি হচ্ছে ওর। কালো ক্যানভাসের পাশে কালো বোতলটা মনে পড়ছে। পারমিতা বোতলটা হাতে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বেসিনের দিকে গেল। শীর্ষ খাবারের থালায় মন দেওয়ার চেষ্টা করল। কালো বোতলটা মাথা থেকে সরছে না কিছুতেই।

-“আরে, বোতলটার রং উঠছে নাকি? এই জন্য বলি উল্টোপাল্টা রঙের বোতল কিনো না। দ্যাখো, কীরকম কালো জল বেরোচ্ছে বোতল থেকে। ছিঃ ছিঃ! এখন এটায় কী করে জল ভরব? এসব প্লাস্টিকের রঙের জল এবার পেটে যাবে।“ গজগজ করতে করতে বোতল থেকে প্রায় সবটা জল বেসিনে উপুড় করে দিল পারমিতা।

স্প্রিঙের মতো খাবার টেবিল থেকে ছিটকে উঠে বেসিনের কাছে গেল শীর্ষ, “কই দেখি আমাকে দাও – কোথায় কালো জল?”

-“আরে পাতিলেবুর টুকরোগুলো কোথায় গেল? বেরোচ্ছে না কেন? নিশ্চয়ই আটকে আছে গলার কাছে” বলতে বলতে বোতলের বড় মুখের ভিতর তিনটে আঙুল ঢোকাল পারমিতা।

-”না না, আমাকে দাও – কোথায় গেল লেবু?” হাঁপাতে হাঁপাতে পারমিতার হাত থেকে কালো বোতলটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করে শীর্ষ।

-“আঃ! আঙুলগুলোয় কী যেন হচ্ছে গো –” চিৎকার করে ওঠে পারমিতা।

-“ছাড়ো ছাড়ো –” শরীরের সব শক্তি দিয়ে পারমিতার হাত থেকে বোতলটা নিয়ে সামনে ছুঁড়ে দেয় শীর্ষ। মেঝে পেরিয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে বোতলটা বারান্দায় গিয়ে পড়ে।

-“এ কী! আমার তিনটে আঙুল এমন ফ্যাকাসে আর ছোট দেখাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছিল কীসে যেন আমার আঙুলগুলো কামড়ে নিচ্ছে।“ হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠল পারমিতা।

পারমিতার কাঁধ একহাতে খামচে ধরে শীর্ষ বলে, “কিচ্ছু হবে না। ঘরে চলো—”

 


ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে বারান্দার দিকে তাকায় শীর্ষ। মেঝেয় পড়ে থাকা কালো বোতলের খোলা মুখটা ঘরের দিকে। হাওয়ায় মেঝের উপর অল্প অল্প গড়াচ্ছে কালো বোতলটা।

 

More Articles